নিজস্ব প্রতিবেদক:
ইশরাক হোসেন মাদকবিরোধী অভিযানে যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা প্রয়োজনীয় হলেও প্রকাশ্যে অস্ত্র বহনের পদ্ধতি সঠিক ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন বলেই ইশরাক হোসেন পদত্যাগ করেছেন। তবে মাদক নির্মূলে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, কার্যকর পদক্ষেপও নিতে হবে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান। এর আগে সকালে নগরের চকবাজার এলাকার সাফা আর্কেডে পৌরসভা ও ইউনিয়ন দায়িত্বশীল শিক্ষাশিবির এবং নগর জামায়াত আয়োজিত সাবেক সাথী-সদস্য সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন তিনি।
ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, এটি দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন বলেই তিনি পদত্যাগ করেছেন।
মাদকবিরোধী অভিযানে ইশরাকের অস্ত্র বহনের বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মাদক সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে মাদকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অভিযানের সময় পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তাই ইশরাকের পুরো কাজকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। তবে তাঁর সঙ্গে অস্ত্র না থাকলে আরও ভালো হতো।
তিনি বলেন, কোনো জনপ্রতিনিধি বা প্রতিমন্ত্রী প্রকাশ্যে অস্ত্র বহন করলে কিংবা কারও দিকে অস্ত্র তাক করলে, উদ্দেশ্য ভালো হলেও তা অন্যদের জন্য ভুল দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। কেউ এ ধরনের ঘটনা দেখে খারাপ উদ্দেশ্যে একই কাজ করার চেষ্টা করতে পারে। ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই সব পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। বিষয়টি নাগরিক আচরণ ও দায়িত্বশীলতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা উচিত।
মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, সংসদে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন পাস হয়েছে। তবে তাঁদের লক্ষ্য শুধু মাদক নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং মাদক নির্মূল করা। এ জন্য আইন প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সাবেক সাথী-সদস্য সম্মেলনে জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী-সদস্যদের আজীবন সংগঠনের জন্য কাজ করার আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান পরিবর্তনের সূচনা করলেও সেই পরিবর্তন এখনো যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি।
জামায়াতের নেতাকর্মীদের অতীতের নির্যাতন, নিপীড়ন ও মিথ্যা মামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের নানা ধরনের প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনের ফলাফলে তাঁরা সন্তুষ্ট না হলেও বৃহত্তর স্বার্থে তা মেনে নিয়েছেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতেও একই পরিস্থিতি মেনে নেবেন।
‘জান্নাতের টিকিট বিক্রি’ করার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁরা জান্নাতের টিকিট বিক্রি করেন না; বরং মানুষকে জান্নাতের পথ দেখান।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, বিভিন্ন এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন, তাঁদের দলের প্রার্থী নির্বাচিত না হলে উন্নয়ন বা বরাদ্দ পাওয়া যাবে না। এ ধরনের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে মানুষ লুটেরা ও চাঁদাবাজদের জন্য রক্ত দেয়নি।
তিনি বলেন, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও অবিচার জনগণ মেনে নেবে না। যারা মানুষের ওপর জুলুম করে, অধিকার থেকে বঞ্চিত করে কিংবা অন্যের অধিকার কেড়ে নেয়, তাদের জবাবদিহি করতে হবে।
গত ১৭ বছরে জামায়াতের ১২ জন শীর্ষ নেতাকে গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেন ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, ওই নেতারা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন এবং একটি সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন।
জামায়াতের প্রতি মানুষের আস্থা এক দিনে তৈরি হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সময়ে বহু নারী-পুরুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। মানুষের এই আস্থা ও বিশ্বাস রক্ষা করা তাঁদের দায়িত্ব।
তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য ও অপপ্রচারের জবাব দিতে সময় নষ্ট না করে জনগণের বাস্তব সমস্যার সমাধানে মনোযোগী হতে হবে। সীমান্ত থেকে সাবেক এক বিচারপতিকে আটকের ঘটনাও শিক্ষণীয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সম্মেলনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আলহাজ শাহজাহান চৌধুরীসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে সকালে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে ডা. শফিকুর রহমানকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মুহাম্মদ শাহজাহান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম এবং মহানগর সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল আমিন।
সম্মেলন শেষে তাঁর হোটেল পেনিনসুলায় যাওয়া, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে চট্টগ্রাম ছাড়ার পরিকল্পনা ছিল বলে সফরসূচিতে উল্লেখ করা হয়।